Sunday, March 10, 2024

হাসনা বানোর গল্পরেখা । আহমদ সায়েম

 গল্প

পাঁখিটার নাম

কি নাম তোমার?

:কেনো তুমি জানো না? অ্যাহহ্যা বলতে হয়, ফের প্রশ্ন করাটা বেয়াদবি।

:না, বার বার নাম জিজ্ঞেস করাটাও বেয়াদবি। আমি তোমার ছোট ত কী হইছে! যারা ভোলে যায় তাদেরকে বার বার বলেলেও ভালো লাগে, কারণ একটা মানুষ মনে রাখতে পারতেছে না, এটা তার অপরাধ নয় অক্ষমতা। আর কারও অক্ষমতা নিয়ে কথা বলাও ঠিক না। যারা কথা বলে বুঝতে হবে তারা ম্যাচিউরড না।

:আর?

:‘আর’ আবার কি!! তুমি কিন্তু এখন আমাকে ইনসাল্ট করতেছ!

:না, তা মনে করার কিছু নেই, তুমি কথা শুরু করলে কিন্তু ভালোই বলো, ভালো লাগার জন্যই ‘আর’টা চলে এসেছে, যা এখন বলা মনে হয় ঠিক হয়নি…

:না না তুমি আমার নাম না বললে ত এভাবে আমার বকবক শুনতে হবে।

:বুঝেছি তোমার সাথে মজা করে কোনোকথা বলা যাবে না।

:যাবে না কেনো! ঠিকঠাক মত বলো সমস্যা কোথায়?

:তুমি তো আমাদের লক্কিপাখিটা হাসনাবানো।




মহারাজের কাছে নালিশ


আচ্ছা মামা, গোপাল ভাঁড়ের গল্পগুলো যে আমাকে পড়তে দিলে, গল্পগুলো পড়তে তো মজাই লাগছে।

: ভালো তো, বইটা শেষ করো, ভালো লাগবে।

 ভালো লাগছে, কিন্তু কিছু প্রশ্ন মনে ডানা মেলছে।

:এটাই হওয়া উচিত, সব কথায় তুমি হ্যাঁ হ্যাঁ বললে, কোন প্রশ্ন করলে না, লোকে তো তোমারে বোদাই ভাববে, তাই না? তো মনে কি প্রশ্ন খেলতেছে শুনি?

:‘রসিক-গোপালের চালাকি’ গল্পের কথা বলতে চাচ্ছি…

:হ্যাঁ বলো শুনি?

:“গোপাল পাড়ার এক দোকান থেকে বাকি খেয়েছে। অনেক দিন হয়ে গেল দেনা সে শোধ করছে না। তখন মুদি রেগে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে আরজি জানাল। পাঁচ টাকা দেনা ছিল সাত টাকার দাবিতে মুদি মহারাজের কাছে নালিশ করল। গোপাল রাজার তলব পেয়ে রাজসভায়” পৌঁছায়, কিন্তু গোপাল মহারাজের কাছে-থেকে তার পক্ষে রায় না পেয়ে তার “রাগ কিছুতেই গেল না। সে এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভাবল।”

:আমি গল্পটা শেষ করি মামা, তা না হলে তোমাকে বলতে পারছি না। 

:হ্যাঁ তাই করো…।

:“মনে মনে সে ফন্দী আঁটতে লাগল-- কী করে এই মুদি জব্দ করা যায়। হঠাত একদিন সে একটা বুদ্ধি বের করল। সেবছরে গোপালের বাড়িতে আখের চাষ খুব ভাল হয়েছিল। সে কিছু আখের গুড় লোকের দ্বারা তৈরি করিয়ে নিল।

তারপর বেশ কিছুদিন সে এমনভাবে আলাপ-ব্যবহার করতে লাগল মুদির সঙ্গে যে মুদির ভুলক্রমেও সন্দেহ হল না তাকে জব্দ করার ফন্দী করছে গোপাল।

গোপাল একদিন কথা প্রসঙ্গে মুদিকে বলল, সে কিছু আখের গুড় সস্তায় বিক্রি করতে চায়। সামান্য লাভ রেখেই বেচে দেবে। টাকার বিশেষ প্রয়োজন। সস্তা দামের কথা শুনে মুদি কিছু গুড় কিনতে চাইল। গোপাল গুড় বিক্রি করতে রাজি হলো যে নগদে ক্রয় করতে হবে। মুদি নগদ টাকা দিয়ে পিপে ভর্তি গুড় সস্তায় কিনে গরুর গাড়ি করে আনন্দে বাড়ি নিয়ে গেল।

কয়েকদিন পরে পিপে খুলে সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। কি সর্বনাশ! সামান্য গুড় উপর দিকটায় আসে বটে, কিন্তু তার তলায় সে সবই বালি মেশানো ইট সুরকির কুচি দানা। হায় হায় করে মুদি কাঁদতে লাগল এবং মনে মনে রাগ হল।

গোপাল গুড় বিক্রি করে নগদ টাকা পেয়ে ছেলে, মেয়ে, বৌ নিয়ে বেশ কয়েকদিন বাইরে বেড়াতে গেল মনের আনন্দে।

মুদি কিছুদিন পর অনেক খোঁজাখুঁজি করে গোপালকে বার করল। গুড়ের তলায় বালি সুরকির কথা বলে চোটপাট শুরু করতেই গোপাল বলল, ‘চটো ক্যান মুদি ভাই? ঘি ছাড়া অড়হর ডাল ব্যাচন যায় না, আর আমি বালি-সুরকি ছাড়া সরেস দানা গুড় বেচুম্ ক্যামনে?’ এই বলে হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।”

:আমার প্রশ্ন হচ্ছে গোপালের পক্ষে রায় না পাওয়ায় এবং এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সে হয়ত কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে? এই প্রতিশোধ নেওয়ার গল্পগুলি একজন লেখক তার পাঠককে জানাতে যাবেন কেন? মামা আমি তোমার কাছে বা জাহিলিয়াত বা জাহিলি যুগের গল্প শুনেছি, তারা ছোট একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেক বছর ঘটনার নানান পরিক্রমায় যুদ্ধ চালিয়ে যেত, আমার তো মনে হয় সেই যুগের থেকে এখন পর্যন্ত মন-মানসিকতায় বিশেষ এগোইনি?

:মাগো গোপাল কী করেছে তার একটা বিহিত করতেই হবে, করবো। তার আগে আমি তো তোমার ফোকাস করার বুনন দেখছি। সুন্দর, ভালো লাগল।

:মামা, তুমি কিন্তু বিষয় থেকে ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করছো...

:না, নারে মা, তা করছি না তবে আমার ভালো লাগাটা তোকে বুঝাতে পারব না, অকে তোমার কথার ঝালেই ফিরি…,  —ছোট করে যদি বলি গল্পটা পড়ে তুমি যে পয়েন্ট নোটিশ করলে তা নিয়েছ তুমার পরিবার থেকে তুমার শিক্ষা থেকে। বাসে উঠলে দেখা যায় সিটের উপরের দিকে লেখা আছে ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’, যদিও কথাটা আমি বিশ্বাস করি না, হবে ব্যক্তির পরিচয়, যাই হোক সেটা অন্য তর্ক, তো যা বলছিলাম...  শিক্ষাঙ্গন থেকে তুমি শিখবে পৃথিবীটাকে কীভাবে দেখতে হয় আর ঘর থেকে শেখানো হয়েছে কীভাবে যেতে হয় শিক্ষাঙ্গনে। এই যাওয়া আর দেখানোটাই হচ্ছে মূল শিক্ষা। এখান থেকেই তুমি পেয়ে যাবে সিন্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। যা তুমি আজ করলে।

:মামা আমি কিন্তু তোমার কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝিনি, আমার মনে হচ্ছে তুমি ধরা খেয়েছ আর আমাকে উল্টোপাল্টা কথা বলে একটা বোঝ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ।

:না রে না, কথা গুলো তোর মাথা পর্যন্ত না গেলেও কান পর্যন্ত তো গেছে এতেই হবে। কারণ আমি জানি প্রতিটা কম্বলই ‘ওম’ দেয় আর তা নেয়ার জন্য বা অনুভব করার জন্য ‘সময়’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা না দিলে পৃথিবীর কোনো ধরনের ফ্লেভার তুমি পাবে না; বুঝবে না।

:আচ্ছা এখানে কম্বল, ফ্লেভার, অনুভব আসছে কেনো? কি বলতেছ এই সব?

:হ্যাঁ বলছি-- দেখোও মা একটা গল্প বা সিনেমা তখনই সফল হবে যখন তার এন্টি হিরো শক্তিশালী হবে, যদি কোনো শয়তান বুড়ি বা ভিলেন ছাড়া গল্প লেখা হয় সেই গল্প কেউ পড়বে না। আর শয়তান লোকটা আছে বলেই ভালো মানুষটাকে সহজেই চেনা যায়। পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী দেশ কোনটা?

:আমেরিকা।

:আমেরিকা!! অকে তোমার কথা মেনে নিয়েই আগাই, কেনো? তারেই কেন সবাই শক্তিশালী বলে সবাই চিনে?

:বড় দেশ, টাকা বেশি।

:হ্যাঁ তা তো ঠিক আছে, দেশে-দেশে যুদ্ধও তো সেই আমেরিকাই চাবি দিয়া দেয়, তার উসকানিতে যুদ্ধ চলতেই থাকে, তবুও আমরা তার দেশেই যেতে চাই, যাই…

:মানুষ তাকে ভয়ে বড় বলে, এমন না কিন্তু; বড় বলার মতো তার অনেক গুণও আছে...

:মা কথাগুলি বুঝতে না পারলেও শোনো, প্রথম দিনই মানুষ বুঝে না। দেখতে দেখতেই দেখে যায় আর শুনতে শুনতে বোঝে। আঘাতের পরে ব্যথাটা বোঝা যায়, সময় মতো ব্লাইন্ড থাকে সব, সব মাধ্যমেই। অনুভূতি শূন্য। 

:সৎ থাকতে হবে; চিন্তায় সততা না থাকলে তুমি তা প্রকাশ করতে পারবে না, প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব বলা যায়। আর এই সততা তোমাকে চিনিয়ে দেবে গল্পের বা সিনেমার শয়তান লোকটা, নায়ক নয়। নায়কের সততা তুমি চিনতে পারবে ভিলেনের চরিত্রের মাধ্যেমে। বাতি জ্বললে চারপাশ আলোকিত হয়, নিভিয়ে দিলে আনন্দ খেলা করে।

:মামাআআআআ... 


০৩/১০/২০২৪











Tuesday, September 26, 2023

বৃষ্টিদিনের স্বর ও ব্যঞ্জনা (গদ্য) । আহমদ সায়েম

 বৃষ্টিদিনের স্বর ও ব্যঞ্জনা 

গদ্য

বৃষ্টিই হচ্ছে। অন্য কোনো শব্দই আর কানে যাচ্ছে না; এই ঝুনঝুন শব্দগুলো-যে কত মধুর তা শুধুমাত্র আয়েশ করে এককাপ লিকার নিয়ে বসলেই মাপা যায়। রাত বাড়ছে আর বৃষ্টির শব্দ যাচ্ছে শৈশবের খেলাঘরে, যেখানে কিছু রঙ-করা কাগজ নিয়ে খেলতে যে-শব্দের দেখা পাওয়া যেত, তা এখনো কানে বাজে; ঐ দিনটা ও ছিল একই মিছিলে আবৃত্ত। বৃষ্টি তার নিয়মেই আছে, সময়ের উচ্চতায় রুচির বদল ঘটেছে যা। ভাইবোন মিলে কাগজের নৌকায় ঘুরেছি সারাটা শহর। বিছানায় বালিশের উপরে বসে করেছি রাষ্ট্রশাসন। সারাটা ঘর ডুবিয়ে দিয়েছিলাম শুধু বৃষ্টির পানিতেই। আজ যা নিজের বাচ্চাদের চরিত্রে দেখে হাসি পায়। আমরা যা বদলে গেছে বলে তকমা দেই, আসলে তার কিছুই ঘটেনি। বৃষ্টি নিয়ে তো তারাও আনন্দে আছে, নৌকা বানিয়ে দিয়েছি, ওরা যার যার বিছানায় বসে-বসে শহরটারে ঘুরে দেখছে। সব গল্প যদি একই হয় তবে আর গল্প বলে লাভ কী। বৃষ্টি হচ্ছে, হবে, একই বৃষ্টি, দেখার ভঙ্গিটা একটু ভিন্ন তো হতেই হয়। যদি গল্পের ভিন্নতা না হতো, আমরা এখনো রবীন্দ্রনাথের বৃষ্টিতেই ভিজতাম। বৃষ্টি যেভাবেই ঝেঁপে আসুক তার মর্ম মাটির ভিন্নতায় ভিন্ন আকারেই বার্তা দিয়ে আসবে, যেমন এখন আমার বোন — সে তার বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে আটকে আছে, যাতায়াতের জন্য কোনো যানবাহনই পাচ্ছে না। বন্ধু জাকির ঘরে বসে রবীন্দ্রনাথের গান শুনছে ...

এমনো দিনে তারে বলা যায়
এমনো ঘনঘোর বরিষায় —
এমনো মেঘস্বরে          বাদল-ঝরঝরে
তপনহীন ঘন তমসায়।।
সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারিধার।
দুজনে মুখোমুখি          গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার —
জগতে কেহ যেন নাহি আর।।

সমাজ সংসার মিছে সব,
মিছে এ জীবনের কলরব।
কেবল আঁখি দিয়ে          আঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয় দিয়ে হৃদি-অনুভব —
আঁধারে মিশে গেছে আর সব।।

বলিতে ব্যথিবে না নিজ কান,
চমকি উঠিবে না নিজ প্রাণ।
সে-কথা আঁখিনীরে          মিশিয়া যাবে ধীরে,
বাদলবায়ে তার অবসান —
সে-কথা ছেয়ে দিবে দুটি প্রাণ।।

তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার
নামাতে পারি যদি মনোভার!
শ্রাবণবরিষনে          একদা গৃহকোণে
দু-কথা বলি যদি কাছে তার
তাহাতে আসে যাবে কিবা কার।।

আছে তো তার পরে বারো মাস —
উঠিবে কত কথা, কত হাস।

আসিবে কত লোক,          কত-না দুখশোক,
সে-কথা কোনখানে পাবে নাশ —
জগৎ চলে যাবে বারোমাস।।

কাকতালীয়ভাবে একই গনের আবৃত্তি শুনছিল তাহমিনা; এমন দিনে তারে বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরিষায় — /এমন মেঘস্বরে / বাদল-ঝরঝরে / তপনহীন ঘন তমসায়... যে একসময় আমার ভালো বন্ধু ছিল, এখনো সে বন্ধুই আছে কিন্তু এখন আর কোনো রঙমহলের আলাপ হয় না। তবে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে মাঝেমধ্যে ফোনালাপ হয়ে, যে-আলাপ নতুন কোনো রঙ তৈরি করতে পারে না, রঙের রঙটাই শুধু বলে দেয়া যায়।

আমরা যে-সময়টায় বৃষ্টিতে ভিজে একাকার তখন অন্য ল্যান্ডে, মানে লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ার নামের চব্বিশতলা ভবনে মূহুর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে আগুন, যা অনেক স্বপ্ন নিভিয়ে দিতে সাহায্য করল, কতজন যে কতরকমভাবে ছিলেন, মা হয়তো তার বাচ্চার সাথে খেলছিলেন, অন্য কোনো বাচ্চা হয়তো তার দাদুর সাথে গল্প করছিল, কেউ হয়তো তার ভাইয়ের সাথে ফোনে আলাপ করছে আবার কেউ তার প্রিয় কোনো মানুষের সাথে মোবাইলচ্যাটে ব্যস্ত...। বড়ই নির্মম এই বার্তা। বৃষ্টির শব্দের সাথে আগুনে পোড়া গন্ধ, তা কোনোভাবেই যায় না। কিন্তু না-যাবার অত কিছু নেই। একই সময়ে যদি দুই রকম ঘটনা ঘটেই থাকে লেখায় তো তার রেশ থাকবেই। ধারাবাহিকতা থাকবে কেন? আমাদের বৃষ্টিতে ভিজে গায়ে জ্বর আসছে আর ওরা কেউ কী কখনো ভেবেছিল যে আর কিছুক্ষণ পরেই এমন মর্মান্তিক স্পর্শে আটকে যাবে তাদের ঘড়ির কাঁটা, ঘরের দেয়াল, চাবির রিং, নাকফুল আর ল্যাপটপে রাখা কত প্রিয়-মানুষের কথা আর তাদের ছবিগুলো! চব্বিশতলা বিল্ডিং, কম বড় ব্যাপার না। আমাদের গরিব দেশের হয়তো দুই মহল্লার মানুষ জায়গা হচ্ছিল ওখানে। ভাবা যায় দুইটা মহল্লার মানুষ বা পঞ্চাশটা ফ্যামিলিই যদি ধরি; একসাথে এতটা মানুষ, গোছানো সংসার, পুড়ে একেবারে হাওয়ায় মিশে গেল! ও-মাই-গড, কোনোভাবেই ভাবা যায় না। তাদের কেউ কী ভাবছিলেন কখনো ...

শুনেছি মৃত্যুর আগে সবাইকেই প্রকৃতি থেকে কিছুনা কিছু মেসেজ দেয়া হয়, দেয়া হয় বা পেয়ে যান — একটাকিছু তো মানতেই হয়। মেসেজের বিন্দুবিসর্গগুলো কেউ পড়তে পারে, কেউ দেখিয়ে যায় তার সংগ্রহশালা। ওরা তবে কী মেসেজ বহন করছিল? কাছাকাছি থাকলে হয়তো জানা যেত কার কী রঙ আর কী ছিল তাদের নিশ্বাসে, জ্ঞানে।

তারা তো তাদের মেসেজে চলে গেলেন, তো? হ্যাঁ, প্রকৃতি সবসময়ই চতুর্মুখী মেসেজ দেয়, আমরা শুধু একটাই পড়তে পারি যা দেখা যায়। মুখ দেখার জন্য আয়নার সামনেই দাঁড়াই অথচ একবারও ভাবি না আয়নার পিছনের গল্প কত লম্বা। গ্রেনফেল টাওয়ার থেকে আমরা কী মেসেজ পেলাম! বা আমাদের কর্মের কী কোনো ত্রুটি আছে বা আশা-জাগানিয়া কোনো গল্প, যা দিয়ে জগতের দর্শনগুলো আঁকা হবে আরো স্পষ্ট করে। আমরা আলোকিত মানুষ খুঁজি, কিন্তু কখনো নিজের আলোটাকে দেখি না। আবার অন্যকে যে-জ্ঞান দেই তা কখনোই নিজের আমলে থাকে না বিধায় এত এত দিতে পারি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে দুইটা লাইন এখানে তুলে রাখি —

কী জানি কী হলো আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ —
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
ওরে, চারিদিকে মোর
এ কী কারাগার ঘোর —
ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর।
ওরে আজ কী গান গেয়েছে পাখি,
এসেছে রবির কর।।

 ভিন্ন মাটিতে ভিন্ন সময়ে আরেকটু ভিন্ন গল্পে দেখা গেল বাংলাদেশের রাঙামাটির বুকে পার্বত্য এলাকায় আরেকটা ভয়াবহ ভূমিধস, এবং এখানেও দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু। প্রকৃতি বারবার — নানান রকমে বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় মানুষকে, কিন্তু কেন? তাদের কত নানান গল্প ছিল। নানান রাশিতে বাঁধা ছিল তাদের জন্ম। অথচ যাবার বেলায় একটা মাত্র ব্যানারে সবার গল্পের সমাপ্তি! সময়ের ছুটির ধরন নানান রঙে সাজানো। কেউ হাসতে হাসতে হারিয়ে যায় কেউ কান্নার নির্মাণ দেখে ঠিকানা পেয়ে যায়। জীবন একটা রঙমহল, কান্নাহাসির দর্শন আর তথ্য নিতে নিতেই সৃষ্টি হয়ে যায় অন্য একটা অবস্থার প্রেক্ষাপট। আমরা হয়তো তার একটা কাব্যিক  নাম দেই অথবা খুঁজে নেই সন্ধ্যার নরম আলো।

এই গদ্যের সাথে হয়তো যায় না, আর যাবেই না-কেন, এই গদ্যটা লিখতে-লিখতেই তো নব্বই দশকের একটা গান খুব মনে পড়ছে। অতএব এখানে তা তুলে রাখছি। আসলে একটা কিছু ভাবতে গেলে আরো নানান কিছু ভাবনায় আসে, কিন্তু আমরা তা আনি না, কারণ তা তো এই গদ্যে যায় না। পড়তে গেলে বেখাপ্পা লাগবে। কিন্তু আমার মনে হয় যতই বেখাপ্পা লাগুক যা আসে তা তুলে রাখা প্রয়োজন, একটা সিরিয়াস ভাবনার সাথে আমাদের মন আরো কতরকমভাবে খেলা করে তা পাঠক জানবে না কেন। গানটার লেখক কামরুজ্জামান কামু। গেয়েছেন আরেক শক্তিমান গায়ন সঞ্জীব চৌধুরী।

তোমার ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা
যে-বাক্য অন্তরে ধরি
নাই দাঁড়ি তার নাই কমা
ভাঁজ খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।

তীর্থে তীর্থে বেড়াই ঘুরি
পন্থে পন্থে বেড়াই ঘুরি
মনকে ব্যাকাত্যাড়া করি
মনের মেঘ তো সরে না
তোমার ভাঁজ  খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।

দাঁড় টেনেছি দাড়ির সঙ্গে
তীর ভেঙেছি তারই রঙ্গে
কী বিভঙ্গ নারীর অঙ্গে
পুষ্পে মধু ধরে না
তোমার ভাঁজ  খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।

বর্ষা দেখাও, গ্রীষ্ম দেখাও
শীত বসন্ত শরৎ দেখাও
স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ শেখাও
উম ছাড়া শীত মরে না
তোমার ভাঁজ  খোলো আনন্দ দেখাও
করি প্রেমের তরজমা।।

কামরুজ্জামান কামু-র গান — তোমার ভাঁজ  খোলো আনন্দ দেখাও / করি প্রেমের তরজমা ... গানটি নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি এই গদ্যে; অন্য কোনো লেখায় কথা বলা হবে এই ভরসায় এই লেখায় নিয়ে রাখলাম। একেবারে যে কথা বলা হয়নি তাও কিন্তু না। ভালোবাসার মানুষকে প্ল্যান করে যেমন বলতে হয় না ভালোবাসি, ঠিক তেমন কথাই বলেছি গানটি নিয়া। মানে গদ্যটা লিখতে গিয়ে অনেকভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে গানের কথা ও সুর। তাই গানটি আপন করে রাখার জন্যই নিজের লেখায় নিয়ে রাখা। অন্য কোনো সময়ে এই নিয়ে আলাপ করা হবে।


 





লকডাউন ৭৮০৭ । আহমদ সায়েম

 লকডাউন ৭৮০৭

জীবন দেখতে হলে, অন্ধ করে তুলতে হবে নিজেকে, আর
নিজেকে দেখতে হলে; বলতে হবে আমি’ই প্রকৃতি...

মেনে নিতে পারলে দেখা যাবে পৃথিবী, আর মানিয়ে নিতে
বললে নিজের সোনালী সংসারটা-ই দেখা হবে... 

প্রভাবিত করার জন্য ফুলশয্যায় বসেছিলাম
এক রাতের পর; অথচ নাটকের পরে দেখা যায়
অভিনয়টা ছিল খা খা অন্ধকার...

না (না) না
হ্যাঁ।

লকডাউন শেষ হবার জন্য শুরু হয়নি
শেষ হবে শুরু হবার পর...

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যার পরে আর যুদ্ধ নেই
কারণ: যুদ্ধের পরে তো যুদ্ধ হয়...

করোনা দিবস পালনের জন্য আর
নতুন কোনও বছর আসবে না
কারণ: তা শেষ হলে তো পালন করতে হবে...

নীরবতায় ভিজতে ভিজতে নানান রকমের অংক খেলা করছে ঘরে
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গুনতে হাতে তুলে নিতে হয় কাগজের অনুভূতি
প্রতিটা পৃষ্ঠায় শুধু বুঁদ-বুঁদ করছে
মেঘের আড়ালে থাকা স্বপ্ন
এবার হয়ত আরও কিছু স্মৃতি এসে জড়ো হবে
শব্দে-শব্দে পাঠ করব নরম ও সবুজ পৃথিবীর শোকার্ত কিছু সময়ের
— করোনাকালের কবিতা
যে কবিতায় আশ্রয় পায় লকডাউনে থাকা চারটা দেয়াল
দেয়ালে-দেয়ালে শুধু কফিনের শব্দ আঁকা, কিছু নির্জনতাও...

ঘর থেকে বের হলেই শুরু হয় আলোয় আলোয় ঢাকা
বাড়ির গল্প, গল্পে গল্পে চলে আসে করোনার দিনপঞ্জি দেখা
এবার কঠিন চরিত্রগুলো নিভে গিয়ে
জন্ম হবে ক্ষুদে পিঁপড়ের বুদ্ধিতে নক্ষত্রের গদ্য লেখা...

যার যেমন দৃষ্টি তার সকল হিসাবও সেই মাপে
দেওয়া হবে; আলো হউক বা বক্ররেখা...

আলো আর উচ্চতায় যতটা বোঝা যায়, ঝরা পাতার
ছায়াতেও সেই আয়োজন রয়েছে; যদি মেনে নেয়া যায়...

করোনা মারতে আসেনি, উচ্চতা দেখতে এসেছিলো...

এক আর দুই পাশাপাশি থাকলেও অর্থ কিন্তু ভিন্ন, আর
আকাশটা সমান মনে হলেও নানান গন্ধে ভরপুর...

দেশে-দেশে নানান ভাষা; মেঘের ভাষা প্রেমের ভাষাও
অনেক আচরণে সাজানো, কিন্তু মনের ভাষা
তা একটা তারেই আটকে আছে, যদি তারে ধরতে পার...

মানুষ দেখার জন্য লকডাউন উৎকৃষ্ট একটা পদ্ধতি
চার দেয়ালের মধ্যে বসে নীরবতার যে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে
তাতে করে আর যাই হোক বৈচিত্র্যগুলো-ই এখন সংস্কৃতি...

সৌন্দর্য দেখেছি আত্মহত্যার পর।

কাছাকাছি থেকে কতোটা দূরত্ব বাড়িয়েছি তা লকডাউন
না হলে দেখা যেত না...

করোনায় হারিয়েছি সংসার; কথা বলার সব আয়োজন
আর  পেয়েছি লকডাউন, যা দিয়ে জন্ম হবে সত্যপৃথিবী...

দূরত্ব দেখিয়ে দিয়েছে প্রেমের নির্মম পথ...

মাকড়শা তার ঝালের মধ্যে বসেই শিকার ধরে, আর
অন্যরা তার চরিত্রটাই এঁকে রাখেন; ভাবেন:একটা শিল্প হইল...

করোনা নিয়ে লিখতে বসলে নীরবতার শব্দ পাই, আর
লকডাউন নিয়ে বসলে নিজের মাঝে হারিয়ে যাই...

দূর থেকে আজানের শব্দ আসে
শব্দ আসে হত্যা ও আত্মহত্যার
করোনার শব্দ খুব সহজ, মাত্র চৌদ্দদিন...


আহমদ সায়েম

সূনৃত’ লিটল ম্যাগাজিনটা সম্পাদনা করেন ২০০০ সাল থেকে, এখন পর্যন্ত নয়টি সংখ্যা বের হয়েছে; এবং অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা ‘রাশপ্রিন্ট’( http://raashprint.com/ ) সম্পাদনা করছেন ২০১২ সাল থেকে।  জন্ম সিলেটে ০৫ জানুয়ারি ১৯৭৮ । কবিতার বই বেরিয়েছে তিনটি, প্রথম বই ২০১৫ ফেব্রুয়ারিতে ‘অনক্ষর ইশারার ঘোর’ এই নামে । বর্তমানে প্যানসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন।


ভুল, দ্বিতীয়-বার করাটা অন্যায় । আহমদ সায়েম

 ভুল, দ্বিতীয়-বার করাটা অন্যায়

যে ভুল করে
সে খারাপ নয়
তার ভুল নিয়ে
‘যে’ কথা বাড়ায় 
              তারে
মনে রাখে সবাই।

ভুল অন্যায় নয়
তবে একই ভুল
দ্বিতীয়-বার
করাটা অন্যায়।

দেখে শিখাটা
কপি করার মতো
      আর
নিজেকে দেখে শিখা
জ্ঞানিদের কর্ম।

ভুল করা
বা
ভুল হয়ে যাওয়াটা
সবার অধিকার
পরে তা না বুঝাটাই
অন্যায়।

তার কর্ম
বুঝে আসে না বলেই
ভাবি
—তার ভুল।

09/26/2022


ভালোবাসা উদিত হয়

যারে ভালোবাসি তারে পর বাসি না বলেই
পৃথিবী এতো সুন্দর আর স্বপ্ন দেখার জন্য উপযুক্ত
ব্যাপারটা খুদায় ভাত খাওয়ার মতো
দুপুরে যা পছন্দ করে খেলাম, পরদিন দুপুরে
তা আর মুখে নিতে ভালো লাগে না
আবার অন্যকিছুর জন্য ভালোবাসা উদিত হয়
ভোরের আলোর মতো সহজ কথা--
             খুদা লাগলে ভালোবাসা চিহ্ন দেখা যায়।

০৭/১৭/২০২২


Saturday, March 5, 2022

গল্প ভাবনা ও গল্পে-যাপনের গান (গদ্য) । আহমদ সায়েম

গল্প ভাবনা ও গল্পে-যাপনের গান


অনিয়ম গুলোই যেন নিয়মে ফেরার চিকিৎসা। সমাজ সংসার বা প্রকৃতির যে ফিজিওথেরাপি চলছে দীর্ঘমেয়াদে সেখান থেকে বের হবার কোনো উপায় দেখতে না পেলেও মধ্যে মধ্যে সূনৃত বের করার স্বপ্নে কেপে ওঠে শরীর। ইচ্ছে থাকলেও সময় ধরে ধরে সূনৃত বের করতে পারি না, তবে বের না করলে যে সাহিত্য-সংস্কৃতির বেশ গেল তেমন নয়। নিজেকে খোঁজে পাবার যন্ত্রণা থেকে পত্রিকাটার জন্ম হয় প্রতিবার। মনে করি ছোটকাগজ গুলো পাঠকের মন যোগানোর পাত্র নয়; একটা ছোটকাগজের জন্ম কে কী মনে করে দেন তা ভালো আন্তাজ করতে না পারলেও -নিজের একটা বই বের করার চেয়ে পত্রিকার মুখ দেখতেই বেশি তৃপ্তি বোধ করি।

একটা বইয়ে নিজের কিছু কথা বলা যায়, নিজের চিন্তাকে শেয়ার করা যায় পাঠকের সাথে; আর পত্রিকায় -একটা বিষয়কে সামনে রেখে অনেক লেখকের সাথে নিজের মতামতকে ইস্টাবলিষ্ট করা যায় বা নিজের কাজের বয়স্করূপ পাঠকের সাথে শেয়ার করা যায়, আর সেই তৃপ্তি আদায়ের জন্যই এতো প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে উন্মোচন করি কিছু মত ও মতামতের।

অনেক রকম গল্প আমাদের পড়া হয় লিখা ও দেখা হয়, কিছু লেখকের গল্প ভাবনা ও গল্পে যাপনের গল্প শুনার সহজ ইচ্ছে থেকেই এই সংখ্যার জন্ম। লিখা দিয়ে অনেকেই সহযোগিতা করেছেন, কেউ সময় সঙ্কীর্ণতায় দিতে পারেননি, অন্য কোনো সংখ্যায় তাদেরও সহযোগিতা পাব এই আশাতে-ই এই সংখ্যার আলোর মুখ দেখল। সবাইকেই অনেক ধন্যবাদ।